জেপি মরগানের জরিপ

চলতি বছরে সবচেয়ে বড় বাজার প্রভাবক শুল্ক ও মূল্যস্ফীতি

২০২৫ সাল শুরুর আগেই অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সব পূর্বাভাসে প্রধান আশঙ্কা হিসেবে উঠে এসেছিল ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব।

২০২৫ সাল শুরুর আগেই অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সব পূর্বাভাসে প্রধান আশঙ্কা হিসেবে উঠে এসেছিল ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব। যেখানে বলা হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট ঘোষিত শুল্ক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হলে বিশ্ব নতুন বাণিজ্যযুদ্ধে প্রবেশ করবে। এছাড়া পুরনো আশঙ্কা হিসেবে জিইয়ে ছিল মূল্যস্ফীতি। গত বুধবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান চেজের বার্ষিক জরিপে সে বিষয়গুলো ফের আশঙ্কা হিসেবে উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ট্রেডার্স বা ব্যবসায়ীয়া পূর্বাভাস দিয়েছেন যে শুল্ক ও মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বাজারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে। এ সংশ্লিষ্ট অস্থিরতা মোকাবেলায় তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে চলতি বছরে বাজারে ইলেকট্রনিক ট্রেডিং বৃদ্ধির সম্ভাবনাও উঠে এসেছে মন্তব্যে। খবর রয়টার্স।

এ জরিপে শেয়ারবাজার, মুদ্রাবাজার, পণ্যবাজার ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদ কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত পেশাদার ব্যবসায়ীদের যুক্ত করা হয়েছে। তারা সাধারণত ব্যাংক, হেজ ফান্ড, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বা স্বাধীনভাবে বাজারে লেনদেন করেন। ব্যবসায়ীরা বাজারের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করেন। এ কারণে আর্থিক নীতি, মূল্যস্ফীতি, সুদহার, শুল্ক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

প্রতিবেদনে মার্কিন ব্যাংকটি জানিয়েছে, জরিপে ৪ হাজার ২৩৩ জন ব্যবসায়ী অংশ নিয়েছেন। উত্তরদাতার মধ্যে ৫১ শতাংশ বলেছেন, শুল্ক ও মূল্যস্ফীতি একত্রে এ বছরের বাজারকে বেশি প্রভাবিত করতে পারে। গত বছরের জরিপে মূল্যস্ফীতি অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল। তবে তখন শুধু ২৭ শতাংশ উত্তরদাতার জন্য এটি উদ্বেগের বিষয় ছিল। এবার তা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা থেকেই আমদানীকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে আসছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্দিষ্ট খাত বা দেশের প্রতি লক্ষ্য রেখে আরোপিত শুল্ক ঘোষণা বছরের শুরুতে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

গত ১ ফেব্রুয়ারি মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ২৫ ও চীনের ওপর ১০ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এরপর সোমবার প্রধান শেয়ারবাজার সূচকগুলো পড়ে যায়। তবে পরদিন মেক্সিকো ও কানাডার পণ্যে শুল্ক স্থগিত করার ঘোষণা দিলে বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়।

ট্রাম্পের শুল্ক বাধা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় পর্যায়সহ বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতিতে প্রভাবের আশঙ্কা জোরালো করে তুলেছে, এমন মন্তব্য ছিল অনেক বিশ্লেষকের। জেপি মরগানের জরিপে অংশগ্রহণকারী অনেকে মনে করেন মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে তুলতে পারে শুল্কনীতি, যার দ্রুত প্রভাব পড়বে বাজারে।

এখন দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে বাজারে মুদ্রার বিনিময় হারে ওঠানামা ব্যবসায়ীদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। এর মাধ্যমে লাভবান বা ক্ষতি সীমিত রাখতে চেষ্টা করছেন তারা। জেপি মরগানের গ্লোবাল ফিক্সড ইনকাম, কারেন্সিস অ্যান্ড কমোডিটিজ ই-ট্রেডিং বিভাগের প্রধান চি এনজেলু বলেন, ‘সপ্তাহের শুরুতে আমরা দেখেছি ব্যবসায়ীরা তাদের পোর্টফোলিও পুনর্গঠনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পদক্ষেপে যুক্ত ছিলেন। কারণ কানাডিয়ান ডলার, মেক্সিকান পেসো ও অফশোর চীনা ইউয়ানের মতো মুদ্রাগুলোর বিনিময় হার ১-২ শতাংশ পরিবর্তন হয়েছে।’

জরিপে অংশ নেয়া ব্যবসায়ীদের অল্পসংখ্যকই বিশ্বাস করেন, সম্ভাব্য মন্দা এ বছর বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। অথচ এক বছর আগে এটি বেশ উদ্বেগের বিষয় ছিল। এবার উত্তরদাতাদের ৭ শতাংশ মন্দার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে ২০২৪ সালের জরিপে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেন ১৮ শতাংশ উত্তরদাতা।

২০২৫ সালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে? এমন প্রশ্নের উত্তরে ব্যবসায়ীরা বেশি উল্লেখ করেছেন অস্থিরতা বা বাজারের দ্রুত ও অনিশ্চিত ওঠানামাকে। বিষয়টি ২০২৪ সালে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকলেও এখন প্রবণতায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। চলতি বছর ৪১ শতাংশ উত্তরদাতা বাজার অস্থিরতাকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গত বছরের জরিপে এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন ২৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।

আগে বাজারের ওঠানামা পরিকল্পিত ঘটনাগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু এখন হঠাৎ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ঘোষণার পর পরই বাজার অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। জেপি মরগানের ডিজিটাল মার্কেটের বৈশ্বিক প্রধান এডি ওয়েন বলেন, ‘এ বছরে অস্থিরতার বিশেষত্ব হলো কিছুটা অপ্রত্যাশিত সময়কাল। অতীতে নির্বাচন বা কর্মসংস্থানের তথ্য প্রকাশের মতো পরিকল্পিত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল বাজার অস্থিরতা। এখন আমরা প্রশাসনের পরিকল্পনা সম্পর্কিত সংবাদ শিরোনামের প্রতিক্রিয়ায় আরো ত্বরিত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি, যা বাজারে দ্রুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।’

জেপি মরগানের ই-ট্রেডিং প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীদের কাছে বাজার কাঠামোসংক্রান্ত সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এ বিষয়ে উদ্বেগের মধ্যে শীর্ষে ছিল তারল্য প্রবাহে প্রবেশাধিকার, নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন এবং বাজার ডাটার প্রবেশাধিকার ও ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো।

ব্যাংকের সমীক্ষায় ধরা পড়া অন্যতম নতুন প্রবণতা হলো ইলেকট্রনিক ট্রেডিং বৃদ্ধির সম্ভাবনা। ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন, চলতি বছরে উদীয়মান বাজারের সুদহার থেকে শুরু করে পণ্য ও ঋণ স্প্রেড পর্যন্ত সব ব্যবসায়িক পণ্যেই ইলেকট্রনিক ট্রেডিং বাড়বে।

আরও